(দু:খ করে নাফিজা বলেছিলো- একদিন পৃথিবীর সকল মানুষ ফিরে যা
বে যার যার ঘরে আর বিস্মৃত হয়ে উপলব্ধি করবে লকডাউনের বিপন্ন সময়!
আসলেই কি নাফিজার প্রার্থনা বিধাতা কবুল করেছেন?কাশ্মীরের মেয়ে

নাফিজা ওমরকে নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র দেখে আমার কষ্টবোধ থেকেই
তাৎক্ষণিকভাবে রচিত এই কবিতা)

উফ ছাড়ো, প্রার্থনায় দুইহাত, আল্লাহর আরশ কাঁপে!
উফ স্পর্শ করোনা, কলঙ্ক ছুঁয়েছে এই জ্যোৎস্নাখচিত শরীর,
কুমারী লউয়ে ভাসছে সূর্যাস্তের ঝিলাম নদী,
উফ হাত দিওনা, পাঁজরের অস্থিতে খামছে ধরেছে মৃত্যুমায়া।
বুকের ভাঁজে ভাঁজে শূল ব্যাদনা, অগ্নোৎপাতে শিহরণ,
আমি কারো প্রেমিকা নই, কারো পত্নী অথবা দয়িতা,
আমাকে জুড়ে আছে নির্জন, নিস্তব্ধ আর রহস্যময় বিষণ্ণতা!

আমি নাফিসা ওমর,
আল্লাহর দোহাই লাগে- থামো পথিক, একবার
দেখে যাও রহস্যময় সুনসান এই নগরীর আড়ষ্ট ঠোঁট,
নি:সঙ্গ অনন্ত নীলিমা, শোকাচ্ছন্ন মধ্যরাত,
আর আমাদের নিশ্ছিদ্রবাস।
অন্ধকার শ্রীনগরে সশস্ত্র জোয়ান টহল দিচ্ছে
কাঁপছে বিধ্বস্ত শহর, স্তব্ধ পাখীদের শীষ,
মধ্যরাতে মায়েরকোলে আঁতকে ওঠে শিশুরা,
নিশ্চুপ, শব্দহীন, স্তবির শূন্যতা নিয়ে কবরে যাপিত আটমাস,
লকডাউনে কাশ্মীর।


জোয়ানদের বুটের আওয়াজ যেন নশ্বরতাকে জানান দেয়,
আমরা যেন পরস্পর দীর্ঘশ্বাসের মত একা হয়ে যাচ্ছি…।
নক্ষত্রসমেত আকাশ আমাদের দেখতে নেই
আমাদের ভাবতে নেই-
উদাস দুপুর, ঝিলেরজলে হংসমিথুন জলকেলি উৎসব,
কিংবা কূয়াশাঢাকা স্নিগ্ধ ভোরের আপেল বাগান।
দেখতে নেই সবুজ উদ্যান, বিস্তৃত মাঠ, নীল আকাশ,
আমাদের দুচোখের সীমানায় আটকে থাকে শুধুই বিস্ময়
আর ভাবনায় বিগলিত হতে থাকে অখণ্ড বিরহের শরীর!

খোদার কসম পথিক, একবার দেখে যাও;
আমরা আটমাস লকডাউনে কেমন আছি?
টেলিফোন, ইন্টারনেট, টু্টাইর, ফেইসবুক সব বন্ধ,
স্কুল, কলেজ, বাজার এমনকি হাসপাতাল।
বরফঢাকা সুউচ্চ হিমালয় এখন আর আমাদের নেই
এখানে সুমধুর আযানের ধ্বনি নেই,

বাজেনা গির্জার ঘণ্টা,
নেই মানুষের কোলাহল, না কোন উৎসব,
লাশের জন্য নেই কোন আয়োজন।
হিমালয়ের মত মৌনতা নিয়ে নিস্তব্ধ শ্রীনগর
এবং বিকলাঙ্গ জম্মু ও কাশ্মীর!
রক্তে ভাসছে শিশু-কিশোরের স্কুলব্যাগ,
যুবকেরা জেলখানায়, নারীরা জ্বলছে বাস্পহীন উনুনে,
বৃদ্ধরা হিজলবৃক্ষের মত নাভিমূল ডুবে আছে
জীবনের পঙ্কিল জলাশয়ে!
আমরা আটমাস লকডাউনে আছি।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই,
আপনি জেনে রাখুন;
আমাদের আটমাস লকডাউনের গল্প,
আপনি লিখে রাখুন গণধর্ষণ, গণহত্যা ও গণকবরের কথা,
কাশ্মীর থেকে পুরুষের অন্তর্ধান আর
যুবতী মেয়েদের বিধবা হবার কথা,
আমরা সত্তর বছর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছি।

আপনি জানেন-
রক্তাক্ত একটি স্বর্গের নাম কাশ্মীর?
ডাল, গঙ্গাবল, কৃষ্ণাশার, নন্দকোল আর কুনসেনগাং হ্রদে
এখন আর বাহারি নৌবিহার নেই
নান্দনিক হ্রদে হ্রদে ভাসছে আমাদের মৃতলাশ!
সবুজ কুমারীবনভূমি আর বিস্তৃত জাফরানজুড়ে
রক্তের জমাট স্তূপ!
সুদৃশ্য হিমালয়ের বরফ স্রোতে
কাশ্মীর ভ্যালীতে বহে চলে রক্তের নহর,
আজ আমরা অপূর্ণ সুন্দরের প্রতিচ্ছবি।

আপনি নাকি মানবতাবাদী লেখক,
তাহলে আপনি জেনে রাখুন মানবতা নামের
কোন শব্দ আমরা কোনদিন শুনিনি,
বিবেকবান মানুষের কোনও গল্পও আমরা জানিনা,
উদারতা নামক বিস্মিত বাণী আমাদের বিচলিত করেনা।
জম্মু ও কাশ্মীর বিবেকবান মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি,
হিমালয়কন্যা কাশ্মীর আজ বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
আমাদের কোন বিকল্প নেই,
লকডাউনে আজ অধিকার বঞ্চিত দেড়কোটী মানুষ।

আল্লাহর কসম, আমার প্রার্থনা বৃথা যাবেনা,
একদিন সারা পৃথিবীর মানুষ যার যার ঘরে ঢুকবেই।
উপলব্ধি করবে তুষারপাতে হাড়কাঁপানো শরীরের নিপুণতা!
পুড়ানো কাঠের মেরুদণ্ডহীন কয়লার মত
বীভৎস ইতিহাস হয়ে থাকবে আজকের লকডাউনের গল্প,
যে গল্পে লেখা হবে আমরাও মানুষ ছিলাম এবং
এখনো বেঁচে আছি নগ্ন মৃত্যুভয়ে হাজার হাজার দিন!

Leave a comment

Trending