পড় তোমার প্রেমিকার নামে: মুস্তাফিজ শফি


ফারুক আহমেদ রনি

১. আদি ভূমিকা

কবিতা হচ্ছে একান্তই কবির ঐন্দ্রজালিক শিল্পসৃষ্টি। ভাবের বৈচিত্র্য নিয়ে কবিতার শিল্পময় শরীর তৈরি করা হয় আর সেটাকে অলংকৃত করা হয়- শব্দ, ছন্দ, মাত্রা আর ধ্বনিগত সুষমার মাধ্যমে। কবিতা পাঠ বা শ্রবণের মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা এবং বিষয়-বর্ণনাকে স্বভাবগত ভাবেই আমরা হৃদয়ঙ্গম করতে চাই। কিন্তু অনেক সব কবিতা সবার জন্য সহজতর ভাবে বিশ্লেষিত করা সম্ভব হয়না বলেই কবিতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা, সমালোচনা বা বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। ‘’Whenever a person reads a poem, they begin to interpret, or make meaning, out of what they read. Some poems are more difficult to interpret than others—perhaps their language is so heightened or abstract that it no longer resembles common speech, or the metaphors, context, or author’s point of view are too unfamiliar to the reader for them to gain entry into the poem. Literary criticism can be helpful at these moments to bridge the gap between reader and poet. Interviews, also, can be useful for understanding a poet’s intentions.’’

একজন কবির সাথে সাধারণ পাঠকের সম্পর্ক তখনই সুদৃঢ় বা শক্তিশালী হতে পারে যখন কবির কবিতা সহজভাবে উপজীব্য হয়ে ওঠে। কবিতা নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা যেমন অত্যাবশ্যক তেমনি আলোচনার মাধ্যমে কবি-স্বত্বাকেও আবিষ্কৃত করার দায়বোধ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। কবিতা থেকে যে আস্বাদন পাঠক মনে পুলক জন্মায় সেটা সাহিত্যের অন্য কোন বিভাগে সম্ভব নয়। তাইতো কবিতাকে ধারণ করার ক্ষমতাও সকল পাঠকের জন্য অনুভূত বিষয় নয়। যারজন্য কবিতাকে নিয়ে মুক্ত এবং সুশৃঙ্খল আলোচনার মাধ্যমে অভিনিবেশ স্বীকার্য। পার্থিব জীবনের নশ্বরতা নিয়ে কবির ভাবনার ভেতর দিয়ে যে প্রখর আক্ষেপন, নির্দেশনা, রসবোধ, ঘটনা-বিন্যাস, অন্বেষণ এবং বিভাজন ইত্যাদি কেবল মাত্র কবিতার বিশ্লেষণে পরিস্ফুটিত হতে পারে, কবিতার আলোচনা, সমালোচনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হতে পারে। একজন কবির ভেতরের চিন্তার শিল্পসম্মত ব্যঞ্জনাকে সরাসরি পাঠকের কাছে উপলব্ধি বা উপস্থাপনের জন্যই উত্তম প্রচেষ্টাই হলো মুক্ত আলোচনা।

কবি মুস্তাফিজ শফি রচিত ‘পড় তোমার প্রেমিকার নামে’ গ্রন্থ নিয়ে আলোচনার এক ধরনের দায়বোধ রয়েছে, তার কারণও যথেষ্ট।

২. কবি মানস: মুস্তাফিজ শফি

চেয়ে দেখো, আমি সেই দুপানির
জলের শিশু- দুরন্ত বালক,
এখনো হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরি
তীরবিদ্ধ শালিকের ধূসর পালক।

সুদর্শন কবি, মুস্তাফিজ শফি। একান্তই নিভৃতচারী কবি। যার পরিচয় সে নিজেই, আর কর্মই হচ্ছে তার নিজস্ব স্বত্বা বা অস্তিত্বের মুল স্ফুরণ । আমি তাকে সম্মান করি বন্ধু বলে নয়, তার কর্মের জন্য। কর্মের প্রতি ত্যাগ আর শ্রদ্ধাই তাকে সাংবাদিকতার মত কঠিন পেশায় প্রতিষ্ঠালাভে সম্পূর্ণভাবে পরিপূরক হিসাবে সহায়তা করেছে।

মুস্তাফিজ শফির সাথে আমার পরিচয় গত দুই দশকেরও বেশি সময়। সংহতির জন্মলগ্ন থেকে নানাভাবে আমাদের সাথে কাজ করে আসছেন। তাকে কবি হিসাবেই চিনতাম। যার মধ্যে দেখেছি ‘ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন’ সৃজন-কল্পনা। দেখেছি সুদূর প্রসারী সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের মন্ত্রশক্তি।

সম্ভবত ১৯৯২ সালে তাকে আমি ঢাকায় দেখি- যদি আমি ভুল না করে থাকি অধুনালুপ্ত ‘লাল সবুজ’ নামের খুব ছোট একটি দৈনিক কাগজের স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করতেন । বেশি দিন না..খুব অল্পদিনের মধ্যে মুস্তাফিজ শফির ডাক আসে আজকের কাগজে……… আর তারই ধারাবাহিকতায় একের পর এক দৈনিক মানব জমিন, প্রথম আলো, আমার দেশ, সমকাল থেকে বর্তমানে কালের কণ্ঠ। তাছাড়াও যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ থেকে একযোগে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্যের কাগজ শিকড়ের জন্য আমারা একসাথে কাজ করেছি বেশ কিছুদিন।  বিশেষ করে শিকড়ের জনপ্রিয়তার পিছনে তার সর্বোপরি ত্যাগ আর শ্রম ছিল অগ্রণী ভূমিকায়।

মুস্তাফিজ শফি সময়ের সিঁড়ি ভেঙে খুব দ্রুততর এগিয়ে যেতে থাকেন। অর্জন করেন নানা স্বীকৃতি। রিপোর্টস ইউনিটি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, লায়ন্স ক্লাব, ইউনেস্কো ক্লাব মিডিয়া এয়ার্ড ও জাতিসংঘ গোল্ড সিড এওয়ার্ড সহ নানা পুরস্কারে পুরস্কৃত হোন।

এই সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে ব্যস্ত সময়ের বেশ ক’বছরের ব্যবধানে একজন কবি মুস্তাফিজ শফি তার মৌলিক জগত থেকে হঠাৎ করে হারিয়ে যান। কারণ একটিই, প্রতিষ্ঠা। আমি রীতিমত ভয়েই ছিলাম- আমি তাকে মাঝে মাঝে বলেছিও.. মুস্তাফিজ আমরা কি একজন কবিকে হারিয়ে ফেলছি.. ? মুস্তাফিজ হাসতেন.. না, আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি। আমাকে আশাহত হতে হয়নি, মুস্তাফিজ শফি ঠিকই ফিরে এসেছেন। তার কাব্যশক্তির সঞ্জীবিত ভাষাচিত্র আর তার অন্তর্নিহিত কাব্যরসের সন্ধান পেয়ে গেলাম। আজ আমার হাতে চলে এসেছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ- ‘পড় তোমার প্রেমিকার নামে’। আমি আলোচক নই, আমি গ্রন্থটি নিয়ে বিশদ আলোচনায় যাবোওনা…। নেহাতই মুস্তাফিজ শফির প্রতি আমার অনুরাগ বা ভালবাসা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে বলেই সার্বিকভাবে একটা আলোচনার সুযোগ নিয়েছি মাত্র। কবিতা মুস্তাফিজ শফির মনও মননে লালিত শিল্পকলা, সময় এবং অবস্থান সাময়িকভাবে তাকে বিচ্ছন্ন করেছে মাত্র কিন্তু তাকে বিচলিত করতে পারেনি, তাকে বিধ্বস্ত করতে পারেনি। পারবেইবা কেন? একজন কবির অভিজাত বন্ধন হচ্ছে  তার কবিতার সাথে আর কবিতা হচ্ছে তার প্রাচুর্য। তার ইহকাল-পরকালের উৎকৃষ্ট সম্পদ। । কবি ওয়েস্ট্যানহিউজঅড্যান  কবিতা বা কবির প্রাপ্তিকে অসামান্য আবদার হিসাবে কেমন করে পরিস্ফুটিত করতে চেয়েছেন, এমন একটি উক্তি যদি দেখি, যেমন;

God may reduce you
on Judgment Day
to tears of shame,
reciting by heart
the poems you would
have written, had
your life been good.

শেষ বিচারের দিন বিধাতাও হয়ত কবিতার জন্য একজন কবিকে তার কষ্টকে সীমিত করে দিতে পারেন.. ! কবিতার মর্মবোধ এবং কবিতার প্রতি আনুগত্য আমাদের জীবন সম্পর্কে কতটা ফলপ্রাপ্তি হতে পারে তার নুন্যতম ধারনা হয়ত কবির দর্শন বা অভিব্যক্তি থেকে তাঁর আত্মতৃপ্তির উৎকর্ষ হিসাবে ব্যঞ্জিত হয়েছে।

কবিও কবিতাকে ছোট করে দেখার কোন উপায় নেই.. হয়ত কবিতাকে নিয়ে ভাবনার সুযোগ আছে, আলোচনার সুযোগ থেকেই যায়।

৩. কবিও কবিতা: পড় তোমার প্রেমিকার নামে

কবিতা হচ্ছে এক ধরনের চুম্বকের আকর্ষণের মত- ইস্পাতহীন বস্তুর সাথে যেমন চুম্বকের যোগ নেই, তেমনি ভাবহীন পাঠকের কাছে কবিতা নিস্প্রাণ। তবে কবিকেও চুম্বক আকর্ষণের দায়বোধ থেকেও মুক্তি দেয়া যাবেনা, যতক্ষণ না একজন কবি তার আত্মগত ভাবকে স্বত:স্ফুর্তভাবে প্রকাশে বা অনুভবে ব্যক্ত করতে না পারছেন ততক্ষণ তার কাব্যশক্তি পাঠকের কাছে আবেদনহীন এবং দুর্বোধ্য থেকেই যাবে।

মুস্তাফিজ শফির কাব্যগ্রন্থ হাতে পেয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি- আবেগ আপ্লুত হয়েছি। মুস্তাফিজ শফির তিনটি গ্রন্থ একসাথে প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালের একুশে বইমেলায়। তার মধ্যে ‘পড় তোমার প্রেমিকার নামে– কাব্যগ্রন্থ আর অন্য দুটি হচ্ছে বিলেতের বাঙালিদের নিয়ে লেখা প্রবন্ধ-‘বিলেতের বাঙালএবং অনুসন্ধানীমুলক প্রতিবেদন- ‘নির্বাচিত অনুসন্ধান। তবে আমি অতীব উৎসাহী তার কাব্যগ্রন্থ নিয়ে।

গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে ৪৪টি কবিতা। প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য। প্রচ্ছদ করেছেন মাহবুবুল হক। প্রকাশ কাল মাঘ ১৪১৬, ফেব্রুয়ারি ২০১০।

গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন- যারা প্রেমে পড়েছেন, যারা প্রেমে পড়বেন এবং যারা প্রেমে পড়ে ব্যর্থ হয়েছেন

তাদের উদ্দেশ্য করে। তারই কথা-
প্রেম মানে শত শূন্যতার যোগফল
এক ফালি আশা
দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ হয়
তবুও সত্য সে যে
শাশ্বত ভালোবাসা।

গ্রন্থটি নিয়ে আমি খুবই হালকা আলোচনা করবো। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার কাছে ভাল লাগা না লাগার বিষয় উত্থাপিত করবো। তবে ভাল বা খারাপ লাগার বিষয়টা একান্তই আমার ব্যক্তিগত। পাঠকের কাছে তার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে এবং বাঞ্ছনীয়।

কাব্যশক্তিই হচ্ছে কবির সবচেয়ে বড় সম্পদ, একজন কবি তার সাহিত্যকর্মের ভেতর দিয়েই আত্মমুক্তির সন্ধান করেন, সমালোচনা বা আলোচনার মধ্যদিয়ে তার সৃষ্টির উত্তরণ স্পষ্টতর করা হয়। কিন্তু আজকাল সাহিত্যের সমাচলোনা, আলোচনা কতটুকুই বা হচ্ছে, সেটা বাংলা সাহিত্যের পৃষ্টপোষকতা শুধু নয় বিশ্ব সাহিত্যের বিবেচনায়ও আমরা সেটা আজ উপলব্ধি করতে পারি। বর্ডসীট কাগজগুলোতে সাহিত্যের কতটুকু জায়গা আছে আমরা কাগজগুলো হাতে নিলেই তার অভাবনীয় অবস্থান জরিপ করতে পারি। এক সময় সাহিত্যের পৃষ্টপোষকতায় বর্ডসীট কাগজগুলোই মুলত প্রধান ভূমিকা রেখে এসেছে। দু:খ করে মার্কিন সাহিত্য সমালোচকজন বার সাম্প্রতিক তারই একটি আলোচনায় লিখেছেন;

A century ago our newspapers commonly ran poems in their pages; fifty years ago the larger papers regularly reviewed new books of poetry. Today one almost never sees a poem in a newspaper; and the new poetry collections reviewed in the New York Times Book Review are down to a few a year. A general, interested public is poetry’s foremost need.

সম্ভবত আশির দশকেই বলতে গেলে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের কবিদের মধ্যে এমনই ক্ষোভ পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে লিটলম্যাগ বা সাহিত্যের ছোট কাগজের প্রতি অনুরাগ, এবং বিকল্প চিন্তা হিসাবে বলতে গেলে লিটলম্যাগ  বাংলা সাহিত্যে বড়সড় একটা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। যেখানে প্রতিদিনের বর্ডসীট কাগজগুলো হা হয়ে বিশেষ বিশেষ সংখ্যার জন্য কবিদের কাছে ধর্না দিতে হয়। যাইহোক, প্রসঙ্গে যাচ্ছি.. ‘পড় তোমার প্রেমিকার নামে

মুস্তাফিজ শফির প্রথম কাব্য গ্রন্থ, আলোচনার সুযোগ পেয়েছি তাই কবিতাগুলোকে শিল্পসঙ্গত, সৌন্দর্য এবং সৃষ্টির সুক্ষ্নাতিসূক্ষ্ন নিরবয়ব ভাব দৃষ্টি নিয়েই পড়তে হয়েছে। কারণ, মুস্তাফিজ শফিকে বন্ধু ভাববার আগে একজন কবি হিসাবেই ভাবছি। একজন সুচিন্তিত কাব্যশ্রষ্টাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি তারই কাব্যসৃষ্টির ভেতর দিয়েই; গ্রন্থের প্রথম কবিতার উদ্ধৃতি থেকেই আমরা দু’ ই মুস্তাফিজ শফিকে আবিষ্কার করতে পারি।

ক.দুজনের দেখা হয়, কথা হয় নিরন্তর- অভিজ্ঞতা বলাবলি করে, হাত ধরে হাঁটে। একজন খবরের কারিগর, আরেকজন রঙের মিস্ত্রি; কাব্যকলা করে, জ্যোৎস্নারাতে ছোটে ভাবনদীর ঘাটে।

আবার বলছেন;

একজন সরব ভীষণ, আরেকজন মৌনতার করে চাষাবাস- স্মৃতির কলসে বান্ধে বাউরি বাতাস; খুঁজে ফেরে মাধবকুণ্ডের মেয়ে, বারুণী বেলা; আরেকজন ভাবে এইসব নিতান্তই ছেলেখেলা।
একজন নির্বোধ খুব, একজন অদ্ভুত চালাক। বাইরের মানুষ বোঝেনা ভেতরের ফারাক।

– মুস্তাফিজ শফির সংগে মুস্তাফিজ শফির যত অমিল 

গ্রন্থের প্রথম কবিতা, চমৎকার একটি পঙক্তি। কবিতাটিতে একান্তই কবি নিজের সাথে নিজের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, বিভেদ অথবা ক্ষোভের অন্তর্হিত অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। কবিতার প্রতি পাঠকের অনুরাগ একান্তই ছন্দের উপর নির্ভরশীল। ছন্দের কারুকাজের মধ্যেই ভাললাগার বিষয়টা কাজ করে। আমার কাছে ভালোলাগার অন্যতম একটি কবিতা… সান্তাহারের সালেহা, নাটোরের ট্রেন।

খ.সান্তাহার ছেড়ে বনলতার দেশে যে ছুটে চলেছে আন্ত:নগর ট্রেন।
ওপাশে বর্ষার নদী, এপাশে বেদেনীর কোলাহলবুড়ো বট। ছায়া থরথর মধ্যদুপর।
ধাবমান হরিণীর মতো দুরে কোথায় কেবলই হারায়- কালো মেয়ের আলোকিত ঝিলিক…

সত্যি আমি যেন নাটোরের ট্রেনে ছুটে চলেছি, খুঁজতে যাচ্ছি নাটোরের বনলতা নয়, সান্তাহারের সালেহাকে। প্রকৃতিকে কাছে থেকে দেখার অদ্ভুত অনুভূতি, নস্টালজিয়া যেন কবিতায় অপরূপ ছন্দবদ্ধ আর বোধসম্পন্ন। শব্দ ব্যবহার, ধ্বনিমাধুর্য, ছন্দসুষমা নিয়ে যে পরিমিত মাত্রা প্রয়োগ হয়েছে তা অনায়াসে পাঠক মনকে আকৃষ্ট করবে। কবিতাটির শরীরজুড়ে রয়েছে পাঠের আবেদন, শিল্পের বুনন প্রভাবিত একটি রূপ-সৌষম্য সৃষ্টি। যেমন; আরেকটি কবিতা- একই ভাবে মাত্রা-বিন্যাস ও ছন্দের অসীম শক্তিকে সুস্পষ্টভাবে অলংকৃত করা হয়েছে।

 গ. আগামী পূর্ণিমার আগে ও নদীআবার জাগাব তোকে
আবার শুনাবো তোকে হারানো সেই গান
যে গানে উথাল পাতাল অসীম সাহসে বুকে তোর
নেমে আসে জলের তুফান
–  হাছন রাজার গান

সাম্প্রতিক কালে বাংলা কবিতায় গদ্যছন্দ একটি ভিন্ন দ্যোতনার প্রয়াস হিসাবে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। বর্তমানধারার কাব্য চিন্তায় গদ্যছন্দের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনার যথেষ্ট ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কাব্য সাহিত্যের উঠোনে যে বিস্ময় আমরা লক্ষ্য করি তা হচ্ছে কাব্যধর্মী গদ্য; অনেকটা নিশ্ছন্দ কবিতার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে উর্বরতাকে আরো বেশি করে সজীব ও গতিময় করে তুলছে তাতে সন্ধেহ নেই। গদ্যছন্দের প্রভাব এখন বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক আধিপত্য সেটা কবিতার সাথে মেলামেশা না করলে বুঝা যাবেনা। বাংলা কবিতায় বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় বিকাশ বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজেই শেষ পর্যন্ত গদ্যছন্দের প্রতি লোভবান হয়ে পড়েন, পরবর্তীতে আমরা গদ্যছন্দের কারিগর হিসাবে জীবনানন্দকে ধরে নিতে পারি এবং তারই ধারাবাকিতায় আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের কবিরা গদ্যছন্দে সবচেয়ে বেশি সাবলীল। কাব্য-ধর্মী গদ্য কবিতাকে আমরা সহজভাবে এখনো নিতে পারছিনা কিন্তু অস্কার ওয়াইল্ডের ‘letter to Lord Alfred Douglas নিয়ে নানা বিতর্কের সুযোগ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত গদ্য-কবিতা হিসাবে সাহিত্যে একটি মাইল ফলক । যেমন; মুস্তাফিজ শফির কবিতায় আমরা গদ্যধর্মী ছন্দময়তাকে আর্বিভাব করি যে ভাবে:

ঘ. শিউলি ফোটা নির্জন রাতে অবিরল খেলা করে বাউল বাতাস
হিমসিমশীতলতায় মাড়াব কুয়াশার চাদর-সামনে দাড়িয়ে দেখি সোনাইয়ের জলে ভেজা শ্যামল কিশোরী। অনেক দুরে যাবো আমি- পথ আগলে দাড়ায় পাহাড় পাথারিয়া, যার পাদদেশে খাসিয়ারমণীরারচনা করে রহস্য আখ্যান।
আবার আরেকটি পর্বে..

এবার নিজেকে ফেরাই অন্যদিকে। সামনে রাশ উৎসব- মণিপুরি সাজে সেজেছে আকাশ, অদ্ভুত মুদ্রায় নৃত্যরত সফেদ সুন্দরীরা জানায় সম্ভাষণ।

– শীত রাতের কাব্য

কবিতাটি রিপ্রেজেন্ট করছে প্রকৃতি, প্রেম- ভালবাসা, সবশেষে সংস্কৃতিকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তাদের সংস্কৃতি বা উপ-সংস্কৃতির বর্ণনা এখানে চিত্রায়িত হয়েছে। যেমন; সিলেটের পাথারিয়া পাহাড়ে বসবাস করে খাসিয়া সম্প্রদায়, তারপর রয়েছে মনিপুরী সম্প্রদায়, এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রাশ উৎসব। মুস্তাফিজ শফি কবিতাটিতে বর্ণনা, বিষয়বস্তু এবং কাব্যরূপ দানে সৃষ্টির বিচিত্র নির্মাণ ক্ষমতা দেখাতে সচেষ্ট বলেই আমার বিশ্বাস।

ঙ. সব নেব এই সব ভুল
ভোরের শিশির এবং
যত ঘাসফুল
 
শৈশবের রং নেব
কিশোরীর দু:খ নেব
তিন মুঠো জল;
লাউতার বটছায়ার হাসি নেব
রাখালের বাঁশি নেব
মুগ্ধতার কারুকাজ নেব
নেব সেই হাওয়ের ফল।
তারপর-
তীর্থে যাব
সব নেব
শুধু তোমাকে নেব না।

–  শুধু তোমাকে নেব না

কবিতার চিত্রায়ন- তার আদর্শগত দিক, ভাব প্রয়োগ পুর্বেকার কবিতার সাথে সামঞ্জস্য থাকলেও অলঙ্কৃত ছন্দ বা বিন্যাস ভিন্র এবং দুটোর কোনটিকেই নীতিদ্রোহী বলা যাবেনা। পাঠক চেতনাকে আন্দোলিত করার প্রয়াস উদ্দীপ্ত।

চ. পড় তোমার প্রেমিকার নামে
স্মৃতির বাক্সে তুলে রাখা শূন্যতার নামে
নদী ও নক্ষত্রের নামে

আবার…

পড় তোমার প্রেমিকার নামে-
ফেলে আসা সেইসব রুমালের নামে
উল্টো অক্ষরে লেখা বিচিত্র চিঠির নামে
আবার..
পড় প্রেম মানে শত শূন্যতার যোগফল
একফালি আশা
দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ হয়- তবুও সত্য সে যে
শাশ্বত ভালবাসা

-পড় তোমার প্রেমিকার নামে

কবিতাটিতে বিরতিচিহ্নের বালাই নেই, ১৬ লাইনের এই কবিতাটিতে কোন দাড়ি, কমা বা কোনরকম যতিচিহ্ন নেই কিন্তু গতি ঠিকই বিদ্যমান। কবি তার শিল্পশৈলীতে স্বতন্ত্র প্রভাব দেখাতে পেরেছেন এবং এখানেই একজন কবির সার্থকতা। বিশ্লেষণ ও ভাবের আভিজাত্য দৈন্যতাকে পরিহার করতে যথেষ্ট পরিপক্ব। প্রথাবদ্ধতার অবসানে এক ধরনের নতুনত্বের প্রবর্তন ঘটানোর যে উদ্যোগ সেটা অবশ্যই নতুন না হলেও  কবিতায়, ছেদ বা যতিচিহ্ন আমরা পরীক্ষামুলক হিসাবে গ্রহণ করেছি। কিন্তু কবিতাকে উচ্চস্বরে পড়তে বা আবৃতি করতে গেলে ‘পাংচুয়েশন’ বা বিরতিচিহ্নের বিষয়টি এখনও বিতর্কিধীন রয়েছে। তবে একটি কবিতার সৌন্দর্য বৃদ্ধির ব্যপারে কবির নিশ্চয় স্বতন্ত্র অভিব্যক্তিতো থাকবেই। তাই এই বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে কবি ও কবিতার উপর।

ছ.আমি-তো প্রতিদিন তার সঙ্গে কথা বলি, বাগানে হাটাহাটি করি, পুকুরে মাছেদের খুনসুটি দেখি- আগের মতোই বলাবলি করি- এবারের পৌষে বড়ভাই ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরলে বড় রুই দুটোকে তুলে আনব। আর মাঝারি আকারের যেটা কাতল আছে ওরা থাক আরো কিছুদিন- মেজ ভাইয়ের বাড়ি ফেরা পর্যন্ত।

আবার…

পবিত্র আয়াতের সঙ্গে মুঠোভর্তি মাটি দিয়ে ভরিয়েছি কবর.. শিয়রের কাছে শিউলি ফুলের চারা, বরই কাটা, মসুর ডাল, বাঁশের বেড়া। তারপর মোনাজাত..
আমি টের পাই, মা আসেন, বারবার আসেন। আমার কাছে গচ্ছিতরাখা জায়নামাজটি বিছিয়ে বসেন। আর আমি স্পর্শ পেতে সেজদার নামে প্রতিদিন চুমু খাই সেই জায়নামাজ।

-মায়ের জায়নামাজ

কবিতাটির বিষয় আমাদের সবাইকেই কম বেশি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অনেকদূরে.. নিজের বাড়ি, একান্নবর্তী সংসার, মায়ের স্নেহ-ভালবাসার সে এক অভিন্ন আকর্ষণ.. সে তো আর কেউ না বুঝুক আমরা বুঝি। যারা জীবনের তাড়নায় মায়ের আচল ছেড়ে অথবা মা পাড়ি দিয়েছেন জীবনের সকল মমত্ববোধ থেকে পরপারে…! আমার ভেতরের কবি মানুষটি যেন জেগে উঠল মুহুর্ত্বে। কবিতায় রয়েছে স্পষ্টতর আবেদন, বেদনা, বিশ্বাস, ভালবাসা আর হারানোর কষ্ট। খুব ভাল লাগার উপাদান বিন্যস্ত কবিতার শরীরজুড়ে।

জ. আমি কান পেতে রই। কুয়াশার জাল ছিন্ন করা ওদের ডাক শুনি। ওদের চিহ্ন লেপ্টে থাকে অনুজ্জ্বল আকাশের গায়। উজ্জ্বল হাসিমুখে ওরা আসছে। আমি কান পেতে রই। আমি চোখ খুলে রই। ওদের ছেড়ে দিতে দিতে সাইবেরিয়ার আকাশ কি কাঁদে না?
অসীম শূন্যতা বুকে নিয়ে চিড়িয়াখানার লেক আকাশের দিকে তাকায়। তবুও চারদিক লেপটানো অন্ধকারে শিকারিরা বন্দুক তাক করে থাকে। শিকারি অপেক্ষা করে, শিকারি কাঁদে  না।

– বিহঙ্গ পুরাণ

মুস্তাফিজ শফির পাখি প্রেম বিশেষ করে সাইবেরিয়ার পাখিদের নিয়ে তার দুর্বলতা বা অতিথিদের প্রতি বেহাগ ভালবাসার সুগভীর মমত্ববোধ জেগে উঠেছে এই কবিতাটির মাধ্যমে। আমাদের সমাজের কতিপয় পাখি শিকারিদের প্রতি তার ক্ষোভ প্রকাশের একটি আদর্শগত চিত্রায়ন।

ঝ.বেদনার বরপুত্র আমি, বেদনাবৃক্ষের ডাল দিয়েই বাঁধব ঘর। মনে রেখো জীবন
মানেই এক চিমটি স্বপ্ন, আধা লিটার দীর্ঘশ্বাস আর একমুঠো বিরহ- এসবের মাঝেও তুমি ঘুমভাঙা রোদ, সোনালি সকাল।

কবি মানেই কি দু:খ বিলাসী! কবিদের নিয়ে এমন সব জিজ্ঞাসা নতুন নয়। কবিরা আবেগপ্রবণ, তাদের ভেতরের চিরায়িত অবক্ষয় হচ্ছে বেদনা আর আখাঙ্খার মধ্যদিয়ে স্বপ্নালিত বিশ্বাস। সেখানে দু:খ-বিলাসিতা হচ্ছে তাদের একান্ত সুপরিকল্পিত ভাবাবেগ। এই কবিতার ভেতর দিয়ে কবি তার স্বপ্নকে আবিস্কার করতে চেয়েছেন, কষ্ট বা বেদনার স্থায়িত্ব থেকে মুক্তির অন্বেষনে। সকল বেদনার সমাপ্তি টানছেন ‘ঘুমভাঙা রোদ, অথবা সোনালী সকালের প্রত্যাশায়। স্বপ্ন এক চিমটি, দীর্ঘশ্বাস আধা লিটার এবং একমুঠো বিরহ– পার্থিব জীবনে উপমাগুলোর ব্যাখা হচ্ছে অমেয়, কিন্তু এখানে কবিরপ্রগমন নির্লিপ্ত, তার অনুভূত খেয়াল মাত্র। শব্দের সাথে ব্যঞ্জনা বারসের অনুপস্থিতি পাঠককে একটুখানি হলেও নিরাশ করতে পারে, আমার বিশ্বাস কবি ইচ্ছে করেই শব্দগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং সেখানে তার প্রজ্ঞাবান উপলব্দি বিবেচিত হয়েছে।

ঞ. তুমি কোথাও নেই- তুমি কি ছিলে কোনদিন
তবুও তোমার কাছে জমা আছে একরাশ ঋণ
—-
মগ্নবাউর যেমন টের পায় জ্যোৎস্নার হাসি
আমিও তেমনি পাই তোমার ডাক শূন্যতার বাঁশি
—-
তুমি কোথাও নেই- তুমি কি ছিল কোনকালে
তবুও তোমার নামে আটকে আছি এই মোহজালে
—-
কিছু প্রেম ব্যতিক্রম- কিছু প্রেম কদাচিৎ আসে
নেই তবু তুমিই আছো নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে

– অস্তিত্ব

অস্তিত্বকে খোঁজার প্রয়াস। কবি অস্তিত্বকে তার চিন্তা বা কল্পনার রুপময়তায় বিভিন্নভাবে আবিস্কার করতে চেয়েছেন। Realisation of existenceনিয়ে বিজ্ঞান এবং দার্শনিক মতবাদ ভিন্ন হতে পারে কিন্তু কবিদের কাছে ‘Self-realisation means self-discovery in the highest sense of the term.’ যেমন অস্তিত্ব নিয়ে কবি শ্রী চিন্ময়– এর আরেকটি কবিতায় এমনই metaphor বা ভাবনার দর্শক পরিলক্ষিত হয়। যেমন;
No mind, no form, I only exist;
Now ceased all will and thought;
The final end of Nature’s dance,
I am it whom I have sought.

জাগতিক বিষয় নিয়ে আমরা প্রতিনিয়তই অস্তিত্বকে খুঁজে বেড়াই এবং তারই কাব্যিক রুপ দিয়ে মুস্তাফিজ তার ভাবনা আর খেয়ালের ভেতর দিয়েও অস্তিত্বের রহস্যজাল উন্মোচন করতে চেয়েছেন। কবি সজীব, বিশুদ্ধ দর্শণের মধ্যেই আস্বাদন অবলম্বন করতে পেরেছেন।

 ট. হন্তারক আমিও সামনে এগোচ্ছি অপরাপর মানুষের মতোই বেড়ে ওঠা স্বপ্নের বুকে ছুরি চালাতে চালাতে। তুমি তো ভালো করেই জানো, আমি আর ফিরব না। জীবন সার্কাসের দড়ি, হেলে-দুলে সামনেই যেতে হয়। পেছনে ফেরার কোন উপায় নেই।

–  সার্কাসের দড়ি

বাস্তবতাকে পরিহার করার ক্ষমতা আমাদের কারোরই নেই। অজ্ঞেয়তাবাদ আমাদের জীবনে নানা ভাবে প্রভাব ফেলে, আমরা ভাবিত হই, অন্তর্হিত এবং পারিপাশ্বিক অবস্থান সম্পর্কে আমাদের প্যারডক্স ্রবৃত্তি  বা মানসিক বৈশিষ্ট্য অবলুপ্তির দিকে ধাবিত হতে থাকে। কবিদের কাছে তাদের চিন্তা বা ভাবনার জগতে চরোমোৎকর্ষ সৃষ্টি বা শিল্পদর্শনের ক্ষেত্রে metaphoric  ভাবাবেগ, স্থিতি ও শব্দ প্রয়োগের বিষয়টা লক্ষনীয়। মুস্তাফিজ শফি তাই করেছেন। জাগতিক নিয়মের প্রথাগত বৃত্তে তিনি মনস্তাপ বা ইন্দ্রিয়ক্ষোভে তাড়িত ।

ঠ.প্রেমিকারা সব পাশের বাড়ির বেণি দুলানো মেয়ে,
যায় দিন যায় মাস তাদের পথ চেয়ে।
সব যেন এক বিমূর্ত ছবি নিপুণ তুলিতে আঁকা,
প্রেমিকার মন উদাসী হাওয়া হয়তো পাবেনা দেখা।

–  পড় তোমার প্রেমিকার নামে: দুই

 ড. বুকের ভেতর স্বপ্ন আছে, স্বপ্ন ঘেরা তুমি
বুকের ভেতর আকাশ আছে, দুর আকাশে তুমি।
অথবা
বুকের ভেতর তোমার ছায়া, শূন্য ছায়ার বুক
বুকের ভেতর কষ্ট ভীষণ, কষ্টে নাকি সুখ।

–  দিন যাপনের আলবাম

ঢ. যুদ্ধের দামামা বাজে, অমানিশা ঘোর
বড়ই বেয়াড়া সে রোদেলা দুপুর

–  জন্মগান ১৯৭১

ণ. এ কোন স্মৃতির গন্ধ ছড়ালে তুমি-
হায় পূর্ণিমা, হায় মাঘচন্দ্রা রাত!
বন জ্যোৎস্নায় এ কার হাহাকার
এ কার কান্নার ধ্বনি?

– বিরহগীত: দুই

উপরোক্ত পঙতিগুলো বিভিন্ন কবিতার অংশবিশেষ, কিন্তু ছন্দের কারুকাজ বর্ধিত করেছে কাব্যময়তার গতি ও ধ্বণিগাম্ভীর্যতা। অনায়াসে কবির দর্শনেরও গভীরতাকে উপলব্ধি করা যায় সহজে।

পড় তোমার প্রেমিকার নামে গ্রন্থের সবগুলো কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে পারলে হয়ত পাঠকদের কাছে গ্রন্থের আবেদন হয়তো বৃদ্ধি পেতো। গ্রন্থের অন্যান্য কবিতাগুলোর মধ্যে –

–         মানবিক শান্তি পাবে
–         অনুসন্ধান
–         পলায়ন
–         রাত্রী শেষের বেদনা
–         প্রসব বেদনায় নীল এক কবি
–         সীদ্ধান্তহীন পদযাত্রা
–         নদী তোর অতো জল নীল নির্জন

সহ অন্যান্য সব কবিতাগুলোই স্নিগ্ধ, বস্তু-নিষ্ট এবং নির্মল। প্রতিটি কবিতাই স্ব স্ব চিত্রকল্প ও ভাব বিকাশে সুস্পষ্ট। সবশেষে গ্রন্থের আলোচনাকে বিস্তৃত করতে পারিনি বলে নিজের দায়বোধ থেকে যেন কোন ভাবেই মুক্তি পাচ্ছিনা। তবে আরো বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে আছে যাতে গঠনমূলক এবং সমৃদ্ধশালী করতে পারি।

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সর্বকনিষ্ঠ নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে মুস্তাফিজ শফি ইতোমধ্যে অভিষিক্ত হয়েছেন। একজন কবি মুস্তাফিজকে অনেক পেছনে ফেলে সাংবাদিক মুস্তাফিজ অনেক দুরে চলে গিয়েছিলেন বলেই আমার বদ্ধমূল ধারনার সমাপ্তি টেনে দিলেন তিনি আজ আমার হাতে কবিতাগ্রন্থটি ধরিয়ে দিয়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে প্রত্যেকটি কবিতার ভেতর দিয়ে উচ্চার্য ছন্দ রীতির সার্থকতা উপলব্ধি করেছি। আমার ধারনার ফুল স্টপ হিসাবে ‘ডোমের টেবিলে স্বপ্ন অথবা কবির জবানবন্দি’ কবিতাকে চিত্রকল্পে নিখুঁত ও সুচারু ভাবে পাঠক হৃদয়ে পরিস্ফুটিত বা সঞ্চারিত করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।  কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো সুখপাঠ্য- সহজেই আকৃষ্ট করে এবং চুম্বকের মতো সামনে টেনে নিয়ে যায়।

নাগরিক জীবন, নস্টালজিয়া, দহন, ভালবাসা নিয়ে কবি তার কবিতায় স্পষ্টবাদী, ভিন্ন দ্যোতনা, ভিন্ন মাত্রায় আকৃষ্ট করতে পারে। মুস্তাফিজ শফির গ্রন্থটি পড়লেই বুঝা যাবে তিনি এখনো আপাদমস্তক কবি। শিকড়ের টানে আপ্লুত নস্টালজিক কবি, প্রেম-ভালবাসায় প্রলোভিত প্রেমিক কবি।


কবি সৈয়দ শাহীন এবং তাঁর কবিতায় প্রেম ও ভালবাসা


সাহিত্যের একটি বিশেষ সৌন্দর্য আর মেধামণ্ডিত শাখাটির নাম হচ্ছে কাব্য সাহিত্য। এর একটি প্রশাখায় অবস্থান কবিতা নামের দিগ-পাশ-তল শব্দ-অলঙ্কারের সুষম ও পরিমিত ব্যবহারের এক নিপুণ মাধ্যম বলা যায়।

আমার হাতে কবি সৈয়দ শাহীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ: উজানে স্বজন খুঁজি..
প্রথম বলতে গিয়ে আমি আৎকে উঠছিলাম! প্রথম- কেন? সত্যি কি প্রথম না আমিই ভুল করছি! তবে এই প্রথমের পিছনে দীর্ঘ আড়াই যুগ সময় ব্যয় হয়েছে…। বহুদিন বিলেতের সাহিত্যাঙ্গন থেকে তিনি ছিলেন বিচ্ছিন্ন… আশির দশকের কবি সৈয়দ শাহীন ২১ শতকের দিত্বীয় দশকে এসে গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। আমি এটাকে এক ধরনের উদাসীনতাই বলবো…
তবে সৈয়দ শাহীন শুধু কবি নন, তিনি একজন কথাশিল্পীও, ১৯৯৭ সালের বইমেলায় তাঁর প্রথম উপন্যাসঘর ছাড়া ঘর’ প্রকাশিত হয়। তাঁকে শুধু কবি বা কথা সাহিত্যিক বললেও ভুল হয়ে যাবে তিনি একজন সার্থক নাট্যকার হিসাবেও সব্যসাচী।

কাব্য সাহিত্যের নানা প্রকার আর শ্রেণীর দিক দিয়ে কাব্যনাটক ও গীতি নাট্য” খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছে। যদিও সবাই কবিতা লেখার যোগ্যতা-দক্ষতা অর্জন করে ফেলতে পারেন, তবুও অনেক সফল কবিকেই কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে খানিকটা হলেও জটিলতা, মনস্তাত্বিক বাধা এবং শব্দালঙ্কারের ব্যবহারে তুখোড় হলেও কিছুটা সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত হন বৈকি! কারণ কাব্য নাটক এবং গীতিনাট্য রচনার বেলায় আছে সুনির্দিষ্ট ধরন, চলন আর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। সৈয়দ শাহীন কবিতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে না রেখে বিস্তারের একটি মৌলিক ক্ষেত্র তৈরী করতে পেরেছেন । তাঁর লেখা ওই শুনি শঙ্খধ্বনি’ এবংঅনুসর্গের পালা’ গীতি বা কাব্য নাটকগুলো অন্যতম এবং তিনি যথেষ্ট প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পেরেছেন। সৈয়দ শাহীনের অনেক রচনাই আমার ভাললাগার উপজীব্য বিষয়। আমি তাঁর সাহিত্য প্রতিভার প্রতি বরাবরই অনুসক্ত।

আমার হাতে কবির কাব্যগ্রন্থ ‘উজানে স্বজন খুঁজি’, প্রকাশকাল: একুশের বইমেলা ২০১১। প্রকাশ করেছে সত্তিক প্রকাশনী, সম্ভবত সাত্তিক হবে। মুদ্রণ ত্রুটি বলে মনে হচ্ছে। প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করছেন সাত্তিক শাহীন। সাত্তিক শাহীন, সৈয়দ শাহীনের ছেলে। কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি একজন শিল্পীকেও আমরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। প্রচ্ছদের ছাপ যথেষ্ট রুচির পরিচয় বহন করছে। আমি সাত্তিককে ১০০তে ৯৯ শতাংশ মার্ক দিতে পারি.. এক পার্সেন্ট আমার একান্তই নিজস্ব বিচারে বাদ দিয়েছি তা প্রচ্ছদের কালার কম্বিনেশনের জন্য। আমার বিশ্বাস আপনাদের কাছে হয়ত ১০০ ভাগই যতার্থ প্রংসশনীয় হতে পারে। আমার অভিবাদন সাত্তিককে।
গ্রন্থিত হয়েছে সর্বমোট ৫০টি কবিতা এবং সেগুলোকে বিভক্ত করা হয়েছে তিনটি পর্বে, যেমন; আদিপর্ব, মধ্যপর্ব ও অন্তপর্ব। সূচীতে পৃষ্টা নাম্বার মুদ্রিত হয়নি, পর্বগুলোকে ভাগ করতে খালি পৃষ্টায় ছোট করে সাদাকালো গ্রন্থের প্রচ্ছদ সংকলিত হয়েছে।

আমার উপর দায়িত্ব ন্যাস্ত হয়েছে গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা করতে এবং বলা হয়েছে আলোচনার জন্য একটি বিষয় বেছে নিতে… । যাইহোক আমার কাছে তাঁর কবিতায় প্রেম, ভালবাসার বিষয়কে সাশ্রয়ী মনে হয়েছে। তবে প্রেম বা ভালবাসাকে আমরা বিভিন্ন সময়ে কাল-পাত্রভেদে ভিন্নভিন্ন ভাবে দেখি, নর ও নারী প্রেম, ঈশ্বর প্রেম, সমাজ ও দেশজ প্রেম ইত্যাদি। তবে প্রেমের সবগুলো বিষয় নিয়েইতো উজানে স্বজন খুঁজি গ্রন্থের কবিতা । তবে আমি শুধুমাত্র মানবীয় অর্থে নর-নারীপ্রেম বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।

যেমন এই গ্রন্থের আমার প্রিয় একটি কবিতা; ন- হইলে। গ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা। আমার আলোচনার শুরু এই কবিতা দিয়ে।

ন-হইলে এই কালাকাল বৃথা যাইবে
ন- হইলে এই স্বর্ণালী ধূসর হইবে

আমরা সময় ধরবো, সাঁতার কাটবো।
তুমি পদ্ম কুঁড়াবে

আমি পুষ্প ছড়াবো

সবশেষে আমি কবি হবো
তুমি কাব্য দেবে
আমরা কবিতা কেটে কেটে নকশী কাঁথা বুনবো।
ন- হইলে এই শিল্প বিবর্ণ হইবে
ন-হইলে এই স্বর্ণলী ধূসর হইবে

সাধু ও চলিত ভাষারীতির মিশ্রণে তাঁর এই গদ্যছন্দের কবিতাটি একটি অভিনব সৃষ্টি। এখানে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষেপণ নিয়ে কোন রকম জঠিলতার সৃষ্টি হয়নি। একটা অস্বাভাবিক গতিতে উচ্চারিত তার ছন্দও কাব্যবিন্যাস। এখানে গুরুচণ্ডালী দোষটা অনায়াসে পরিহারকৃত। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধু-চলিত ভাষার বিষয়ে যথেষ্ট বাধ্যবাধকতা আছে তবে কবিতার বেলায় সেটাকে উৎরে গেছেন সয়ং রবীন্দ্রনাথই, তাহাও বিশেষ করে গদ্যছন্দের কবিতায়।
নারীপ্রেম বিষয়ে সৈয়দ শাহীন সম্ভবত অসাধারণ অনুভূতিপ্রবণ। কবিতাটির মধ্যে নর এবং নারী প্রেম বিষয়ক শৈল্পিক রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। প্রতিনিধিত্ব করছে বিশ্বাস, স্বপ্ন এবং অঙ্গিকার।

সৈয়দ শাহীনের কবিতা গ্রন্থে প্রেম ও ভালবাসা নিয়ে কবিতার বিষয় হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন প্রেম, নারী, যৌবন, জীবন, স্বদেশ ও সমাজকে।

দেবী কবিতায় আমরা দেখি এমন করে:
ঈশ্বরের দোহাই ফিরিয়ে নিওনা মুখ
দারুন অভিমানে সংকুচিত হয়ো না

কবিতাটিতে প্রেমের বিষয়টাকে আপেক্ষিকভাবে তাঁর অধরা রূপ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তিনি। কবিসত্তার অনন্ত শূন্যতাকে পরিহার করতে এমনই আবেদন তাঁর কবিতায়। অসাধারণ প্রেমময় সৌন্দর্য মন্ডিত পংক্তির মধ্যে ছন্দের অলংকারময় চিত্রায়ন।
জন ডনের কবিতার মতই আরেকটি আবেদন দেখতে পাই- যেমন;
For god sake
hold your tongue,
and let me love..

আমারও সবুজ আছে কবিতাটিতে তিনি বলছেন;
এই এক জীবনে কত দেখবি গৌরী
এই এক যৌবনে কত ধরবি রং বাহার!
আবার
এই এক জনম গৌরী আর তো বেশী নয়
এইভাবে একে একে ইচ্ছেরা পাখা মেলে
হোলি খেলে রং ছড়ায়
এই হয় এই ভাবেই হয়ে যায়
শিশিরের স্বপ্নীল ঘাসে পতন
ভেবোনা, আমারও সবুজ আছে

ভেবোনা, আমারও সবুজ আছে। এই লাইনটির ভেতর দিয়ে কবি তার যৌবণের কথাই বলছেন, চ্যালেঞ্জ করছেন গৌরী বলে আখ্যায়িত তার প্রেমিকাকে। বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণাজাত অস্থিরতা, তাঁর কবিতার নামকরণ, চরণ ও শব্দবিন্যাস এবং ছন্দ-অলঙ্কার প্রয়োগের মধ্যেও আভাসিত হয়েছে। প্রেম প্রত্যাশায় তাঁর আকুতি আরূঢ় আত্মসমর্পণে পরিণত হয়েছে কখনো কখনো। কখনো আবার প্রণয়িনীই হয়ে উঠেছে স্বৈরিণী।

সৈয়দ শাহীন তার প্রেম’ কবিতায়
মুখরিত জলসায় সব কোলাহল
একপাশে ঠেলে যে তানপুরা সুর তোলে
বলি
ভাল আছি
পরানের গহীনে গলিয়ে বরফ ও বললে
বেশ
রেশটুকু তার মনের মধ্যে রয়েই গেলো
এবং আবার দেখা হলো
হঠাৎ করে যেমন হয়ে যায়
ঠোঁটে মোনালিসার রহস্য ধরে
বলল
যাচ্ছে দিন চলিচলি
জনান্তিকে একান্তে বললেম
রাতের প্রহর স্বপ্বে আঁকড়ে ধরে রাখে

প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কবির প্রতি প্রণয়ে স্থিত হচ্ছে না সেই নারী। শুধু শুধু তার সম্মোহনী দৃষ্টি দিয়েই কবিকে আকৃষ্ট করছে বার বার। তার রহস্যময় আচরণে জটিল হয়ে যাচ্ছে কবির অন্তর। মোনালিসার ঠোঁটের রহস্যের মতো কবির কাছে প্রেম যেন একান্তই রহস্যময় তারপরও তিনি বিশ্বাসবিচ্যুত হোননি কারন পরিশেষে তিনিই বলছেন;
পদ্মফুলে সুবাসিত ওর হাত দুটি টেনে
ভালবাসার ঢালি বুকের তৃষিত অলিন্দে
এইতো সুখে আছি
কবির আরেকটি কবিতা- রাধা আমি এবং নিমগ্ন প্রহর
রাধাকে প্রায় ভাবি জিজ্ঞেস করি
কি এতো মগ্ন প্রেমে!
আবার তাঁর ইচ্ছে করে…
রাধাকে প্রায়ই ইচ্ছে হয় নিয়ে যাই ব্রজধাম
আরন্যক গোধুলীর মায়াবী খেলায়
গায়ে মাখি সমাহিত সুখের প্রলেপ
প্রেমের জলকেলী আর কি চাই!
এখনও কখনও সেইভাবে রাধার সাথে হয়নি দেখা

তবুও কবি তার প্রেম প্রত্যাশায় উদগ্রীব। প্রেম উচ্ছ্বাসে অভিহিত যৌবন তাঁর কাছে বৈরী অথচ আকাঙ্খায় পরিণত হয়েছে শেষ পর্যন্ত। আর সব উদার প্রেমিক কবির মতো সৈয়দ শাহীনের জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত জিজ্ঞাসার নিরন্তর উৎস এই পৃথিবী ও পার্থিব জীবন। অনেকটা হতাশামগ্ন, সীমাহীন শূন্যতায় আচ্ছন্ন যদিও তিনি বাস্তবতা নিয়ে আশাবাদী…

তুমি চলে গেলে কবিতাটির একটি পর্বে তিনি লিখেছেন;
তুমি চলে গেলে আমার শৈল্পিক তুলি সব শুকিয়ে যাবে
যতসব ভালবাসা খরজলে নিদাঘ ঘৃণা হবে!

কবিতাটিতে শব্দের নির্মান কুশলতাও জটিল নয় । চিত্রকল্প বেশ মনোরম। উপমা ও দৃশ্যকল্প রূপকার্থে ও চিত্রকল্পে সরস। খরজলে নিদাঘ ঘৃণা হবে- কবির ভেতরের উদ্বেগ, শংসয়, ঘৃণা আর অতৃপ্ততাকে চিত্রিত করছেন খরজল শব্দের নান্দনিক উপমায়। মেটাপোর অত্যন্ত সাবলীল এবং শৈল্পিক। কবিতার নির্মাণ শৈলীতে গদ্যগুণসমৃদ্ধ আধুনিকতার ছাপ বিদ্যমান।

পোড়ামুখী তুই দিলি
কি আর দিবি কি আর নিবি
পোড়ামুখী বল
গলা জলে গলায় দড়ি
এ কোন পিরিত বল!

ঘর ছাড়াইয়া ঘর বাঁধিলি
সেই ঘরেতে ঘর বাধাঁলি
বিরান মাঠে চিতা দিলি
আর কি দিবি বল
পোড়ামুখী আর কি নিবি বল..

চমৎকার পদ্যছন্দে বাধিত সহজ পঙক্তিমালা। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সৈয়দ শাহীন কোন চাতুর্যতা কিংবা জোর জবরদস্তী করেননি। কবিতাটির চিত্রাংকনে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ ও কবিতার গল্প নির্মাণের প্রয়োজনেই তিনি এসব শব্দকে অতি সহজ সরল ভাবেই প্রয়োগ করেছেন। সহজ স্বীকারোক্তিতে সেটা শুধু বক্তব্যে ও চিন্তায় কাব্যদেহে সমাচ্ছন্ন হয়নি। সহজ শব্দচয়ন কাব্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর বিচিত্র উপমা ও চিত্রকল্পের উপাখ্যান এবং ভাষা ব্যবহার কৌশল আমাদেরকে একদিকে যেমন একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে জাগিয়ে তুলেছে চিরন্তন আগ্রহ ও কৌতুহল। চটপটে পঠিত, একান্তই সারল্যও ছন্দবদ্ধ। তার সঙ্গে আছে সেই ঘুরে ঘুরে ধ্বনি, কিংবা শব্দচিত্রের পর শব্দচিত্রের বিন্যাসে একটা আবর্ত সৃষ্টি, এক প্রচ্ছন্ন আর্কেস্ট্রার নিবিড়তা।
যেমন আরেকটি কবিতায় আমরা দেখি:
জলছল আঁখি ছলছল মন ছলছল করে
যেথা মর্মর ব্যথা মোর মোর-তুমি নাই ঘরে
আবার
মনের ঘরে মন রাখো দেহের পরে দেহ
আজ ভালবাসার জলসাঘরে লয়ের সমারোহ
এখানে আরো বেশ কিছু কবিতায় যেমন
ভালবাসা: পক্তিমালা
ভালবাসা: কথা মালা
অথবা ভালবাসা: পদাবলী
ভালবাসা: শব্দাবলী
একই রকম ছন্দের বা ছন্দবদ্ধ পঙ্ক্তি তাঁর কবিতায় বিরল নয়..
যেমন:
তোমায় যেদিন কাছে টানি
হাটতে জনারণ্যে
একশ একটা পাখি উড়ে

আমার উদ্যানে

আমার চোখে যেদিন তুমি
রাখলে তোমার চোখ
সাত সাগরের পিয়াস এসে
ধরফড়ালো বুক
শব্দ ব্যবহারের দক্ষতায়, উপমা রূপকের চাতুর্যে, চিত্রকল্পের পরিকল্পনায় তিনি পূর্ণত নাগরিক বৈদগ্ধের অধিকারী। রোমান্টিকতা তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, সেহেতু নারী প্রণয় তাঁর কবিতার কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গসমূহের অন্যতম। সকল কবির ন্যায় তিনিও ভালোবাসার আশায় উদ্দীপিত, নারী সৌন্দর্যে নিবেদিত, এবং শুধু নারী প্রণয়ের বিনিময়েই আত্মসর্বস্ব বিসর্জন দিতেও অপরাঙ্মুখ থাকেন। কখনো আবার ভালোবাসা হারানোর আশঙ্কায় হন বেদনাহত। এমনকি অবস্থার প্রেক্ষিতে কখনোবা বিদ্রোহী প্রেমিকও। এসবের প্রত্যেকটিতেই রয়েছে শিল্পীসুলভ আবেগের অকপট প্রকাশ। প্রেম যে পরম আকাঙ্ক্ষার বিষয় তা তাঁর কবিতা পাঠের প্রারম্ভেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।

জলপাই রং শাড়ীর রমণী
খেলা
আসো কিবা নাহি আসো
খেলাঘর
নন্দিনীর সাথে ঘর সংসার
আলাপচারী
ব্রজের রমনী
ইত্যাদি কবিতাগুলো মুলত প্রেম বা ভালবাসার রঙ তুলিতে চিত্রায়িত একেকটি আলাদা আলাদা নির্মাণ শৈলী।

পদ্য ছন্দের সারল্যতাকে ছাড়িয়ে তাঁর গদ্য কবিতায়ও পাওয়া যায় ক্ষেত্র বিশেষে বাঁধা ছন্দের ধ্বনিস্পন্দন৷ তাতে তাঁর গদ্য কবিতার চারিত্র্য বিনষ্ট হয়নি। আপন কবিসত্তা নিয়ে সংশয় ও সাহস দুটোই ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কবিতাগুলোতে। খুবই স্পষ্ট ও সরল স্বীকারোক্তি।

হৃদয় ছোয়া উপমা উৎপ্রেক্ষা, সমাসোক্তি, অনুপ্রাস, প্রতীক ও রূপকল্পের বৈচিত্রময়তাই মুলত আধুনিক কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এ কাব্যগ্রন্থের ভালবাসা ,প্রেম ও বিরহকে কেন্দ্র করে সবগুলো কবিতা নিয়ে আজ আলোচনা সম্ভব না। হয়ত একটা দীর্ঘ আলোচনা হতে পারতো, এবং আমার বিশ্বাস আমি আলোচনা করবো। কারন আগেই বলেছি সৈয়দ শাহীনের সাহিত্যের প্রতি আমার উদাসীনতা রয়েছে।

আমি বলবো উজানে স্বজন খুঁজি কাব্যগ্রন্থে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বাছ বিচার করেননি। দুর্বোধ্য শব্দ চয়নের মাধ্যমে অভিধানের ধারস্থ হননি এবং কবিতার গতি, ছন্দময়তাকে বিনষ্ট করতে দেননি ।
সত্তর দশকে এসে কবিতায় রাজনৈতিক ভাষা শ্লোগান প্রধান হয়ে উঠলেও কোথাও কোথাও সহজতা হয়ে পড়ল যোগ গদ্য-পদ্য প্রধান। যেখানে ভাবের সন্ধান মিললেও শিল্প ব্যাহত হলো কিন্তু আশির দশকের শেষের দিক থেকে নব্বুইয়ের দশকের কবিদের ভেতরে দ্রুত চেঞ্জ লক্ষণীয় এবং সেখানে সহযোগীতা করলো সাহিত্যের ছোট কাগজগুলো কিন্তু সে যাত্রার ধ্বনিই হয়ে পড়ল জটিল-কুটিল। জটিল-কুটিল অর্থে দুর্বোধ্যতার প্রচারণাকে বুঝাতে চাচ্ছি। শব্দ ব্যবহারের চাতুর্যতায় শিল্পময় সুন্দর ও কবিতার গতি বিচ্যুত বলা যায়। অভিধানের সাহায্য নিয়ে কবিতা যদি লেখার মানুষিক প্রক্রিয়া বাড়ে, তাহলে সাহিত্যে নতুন শব্দের যোগন দেবে কারা? কবিদেরইতো সেখানে এগিয়ে আসার চিন্তা করতে হবে। শব্দ চয়নকে বস্তুনিষ্ট ও স্বাভাবিক রাখা কবিদের জন্য অতি বাঞ্চনীয়। বর্তমান সময়ে তৃতীয়বাংলার কবিদের ভেতরেও সে রকম একটা শব্দ বিলাসিতার উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সৈয়দ শাহীন সম্পূর্ণ আলাদা। খুবই সুস্পষ্ট ভাবে তিনি এড়িয়ে গেছেন কৃত্রিমতাকে। সুন্দর ও নান্দনিক চিন্তাকে তিনি লালন করেন। তিনি সচেষ্ট এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধে বিশ্বাসী।

সবশেষে আমি বলবো সৈয়দ শাহীন দীর্ঘদিন পর প্রকাশ করেছেন কাব্যগ্রন্থটি, তবে প্রকাশনার কাজে নিশ্চয়ই তাড়া করেছেন। এবং প্রকাশনার বিষয়ে নিতান্তই উদাসীনতা কাজ করেছে। কবিতায় যদি মুদ্রণ ত্রুটি থাকে সেটা মারাত্বকভাবে আপত্তিজনক। আমার মনে হয় তিনি এ বিষয়ে যথেষ্ট সাবধান থাকবেন আগামীতে।

সৈয়দ শাহীন সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায় তিনি সুন্দরের স্বপ্নকে লালন করেন । আর তাঁর এ যাত্রার জন্য তিনি হৃদয়ে সঞ্চিত রাখেন কবিতায় প্রেমের মন্ত্রমুগ্ধতা । এ মন্ত্রমুগ্ধতাতেই অবগাহন করে তিনি সামনের দিকে এগুতে চান । কবিকে অভিবাধন এবং সাহিত্যে আবারও শোভাযাত্রা কামনা করছি। আর যেন আমরা তাঁকে না হারিয়ে ফেলি। আমার বিশ্বাস কবিরা যেখানে যে অবস্থানে বা পরিবেশে থাকেন না কেন তাকে কবিতায় ফিরে আসতেই হয়। আর এ বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উদাহরন কবি সৈয়দ শাহীন। জয় হোক কবি ও কবিতার।

One response to “গ্রন্থ আলোচনা”

  1. I liked the book “Ujane Shojon Khuji”, it was very interesting. How can I get this book?

    Like

Leave a reply to Yasmin Ruby Cancel reply

Trending